আবির সিকদার (বিএম কলেজ),
দক্ষিণাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের সনাতন ধর্মাবলম্বী (হিন্দু) ছাত্রদের একমাত্র আবাসন ‘কবি জীবনানন্দ দাস হোস্টেল’। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা একটু কম খরচে পড়াশোনা ও থাকার আশায় এই হোস্টেলে সিট নেন। কিন্তু বর্তমানে এই ছাত্রাবাসটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য এক নীরব নিপিড়নে পরিণত হয়েছে। ডাইনিংয়ের নামে রমরমা ব্যবসা, পুষ্টিহীন খাবার সরবরাহ এবং কতিপয় অছাত্র ও সিনিয়রদের স্বেচ্ছাচারিতায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস জীবন ও স্বাস্থ্য এখন চরম হুমকির মুখে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হোস্টেলের ডাইনিং চালু করার পেছনে শিক্ষার্থীদের কল্যাণের চেয়ে কতিপয় (অছাত্র) সিনিয়রের আর্থিক স্বার্থই বেশি প্রাধান্য পায়। যখনই কিছু সিনিয়র শিক্ষার্থীর অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়, তখনই ডাইনিং চালুর তোড়জোড় শুরু হয়। সাধারণ ছাত্রদের ডেকে নামমাত্র বৈঠক করে নিজেদের পছন্দের অনুগত কাউকে ডাইনিং ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর জারি করা হয় কঠোর নিয়ম হোস্টেলে থাকতে হলে ডাইনিংয়ে খাওয়া বাধ্যতামূলক। মূলত, ডাইনিংয়ের ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতেই এই নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের। কতিপয় সিনিয়রের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের ভয়ে জুনিয়র শিক্ষার্থীরা এর বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পায় না।
হোস্টেলের ডাইনিংয়ের খাবারের মান নিয়ে ক্ষোভের শেষ নেই । দুপুরের খাবার সরবরাহের সাধারণ নিয়ম ভঙ্গ করে প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৩:৩০ মিনিটের আগে খাবার দেওয়া হয় না, যা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও রুটিনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী খাবারের মেনু বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুপুরের মাংসে নামমাত্র পিস (১০০ গ্রাম মাংসকে ৪-৫ টুকরো করা) অথবা শুধু আলু আর ঝোল জোটে শিক্ষার্থীদের কপালে। আর মাছের দিনগুলোতে বাজারে সবচেয়ে কমদামী পাঙ্গাস মাছের সাথে গাটি কচু, মূলা বা পেঁপের মতো সবজি মিশিয়ে নাম মাত্র মসলা, তেল ও হলুদ ছাড়া রান্না করা হয়। রাতের খাবারেও জোটে কমদামী সবজির মিক্সড তরকারি, যা মুখে দিলে মনে হয় কেবল পানি দিয়ে সেদ্ধ করা। মিল চার্জ দেওয়ার পর অধিকাংশ সাধারণ শিক্ষার্থীর বাইরে থেকে ভালো কিছু কিনে খাওয়ার সামর্থ্য থাকে না। বাধ্য হয়ে এই পুষ্টিহীন খাবার খেয়ে অনেক শিক্ষার্থীই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন।
এসব বিষয়ে কবি জীবনানন্দ দাস হোস্টেলের তত্ত্বাবধায়ক উজ্জ্বল কুমার পাল স্যারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডাইনিংয়ের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “মাত্র ৮০ টাকায় ৩ বেলা খাবার দেওয়া হয়। এত অল্প টাকায় শিক্ষার্থীদের চাহিদা মোতাবেক সম্পূর্ণ পুষ্টিকর খাবার হয়তো দেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়া এই টাকার মধ্যেই রান্নার জ্বালানি খরচও অন্তর্ভুক্ত থাকে।”
হোস্টেলে বর্তমানে ১২০-১৩০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত থাকার বিষয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “ডাইনিং নিয়মিত চালু রাখতেই শিক্ষার্থীদের ডাইনিংয়ে খাওয়ার জন্য বলা হয়, তা না হলে ডাইনিং বন্ধ হয়ে যাবে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, মাস্টার্স শেষ করার ৩-৪ বছর পার হয়ে গেলেও অনেকে এখনো অবৈধভাবে হোস্টেলের রুম দখল করে আছেন। শুধু তাই নয়, হোস্টেলের পুকুরে মাছ চাষ করা, আঙিনায় শাক সবজি চাষ করে ব্যক্তিগত কাজে বা পরিচিতদের বাসায় পাঠানো এবং ডাইনিংয়ে নিয়মিত বিনামূল্যে খাওয়ার মতো অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। বর্তমান ডাইনিং ব্যবস্থাপনায় থাকা ম্যানেজাররাও এই সিন্ডিকেটের চাপের মুখে অসহায় বলে জানা যায়।
হোস্টেলে অছাত্রদের অবৈধ অবস্থানের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক উজ্জ্বল কুমার পাল সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “হ্যাঁ, বেশ কিছু শিক্ষার্থী রয়েছে যাদের ছাত্রত্ব নেই কিন্তু হোস্টেলে বসবাস করছেন। তাদের একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলেও তারা হোস্টেল ছাড়ছেন না। কিছু শিক্ষার্থী চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাই তাদের প্রতি আমরা মানবিকতা দেখাচ্ছি। কিন্তু কিছু শিক্ষার্থীর অনেক আগেই ছাত্রত্ব শেষ হলেও তারা এক প্রকার জোর করেই হোস্টেলে বসবাস করছেন এবং তারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখান।”
এই সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা, ডাইনিং সিন্ডিকেট এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অছাত্রদের হোস্টেল দখল করে রাখার বিষয়ে সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শেখ মোঃ তাজুল ইসলাম-এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি, হোস্টেলের তত্ত্বাবধায়কের এই অসহায়ত্ব এবং অধ্যক্ষের নীরবতার সুযোগ নিয়ে অছাত্ররা হলের পরিবেশ আরও বিষিয়ে তুলছে। কবি জীবনানন্দ দাস হোস্টেলের এই ডাইনিং সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো অছাত্রদের দ্রুত হলমুক্ত করতে কলেজ প্রশাসনের অবিলম্বে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন (আর্তমানবতার সেবায়) বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩