বাবা পড়েছেন পঞ্চম শ্রেণি, মা দ্বিতীয়—তাদের স্বপ্নের সন্তান আজ ৪৭তম বিসিএসে কাস্টমস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত
মিজানুর রহমান, বিশেষ প্রতিবেদন:আমার বাবা পঞ্চম শ্রেণি এবং মা দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। দারিদ্র্যের কষাঘাতে তারা নিজেদের পড়াশোনা খুব বেশি দূর এগিয়ে নিতে পারেননি। কিন্তু শিক্ষার প্রতি তাদের তীব্র আকাঙ্ক্ষা কখনো কমেনি। নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন সন্তানদের মাধ্যমে পূরণ করতে চেয়েছেন তারা। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল—আমি ডাক্তার হবো।
সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় দুইবার চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুবারই সফল হতে পারিনি। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে পড়ার সুযোগ পাই। পরবর্তীতে বুঝেছি, জীবনের কোনো ব্যর্থতাই আসলে শেষ নয়; অনেক সময় একটি ব্যর্থতাই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আমার পরিপূর্ণ বিকাশের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। শিক্ষক-শিক্ষিকা, বন্ধু-বান্ধব এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় প্রাণিবিদ্যায় অনার্সে ৩.৬৮ এবং থিসিসসহ মাস্টার্সে ৩.৮২ সিজিপিএ নিয়ে উত্তীর্ণ হই। পরবর্তীতে সরকারি চাকরির প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এই একাডেমিক ফলাফল আমার আত্মবিশ্বাস ও মনোবল বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।
চাকরির পরীক্ষার জন্য পড়ার চেয়ে জানার জন্য পড়ার প্রতি আমার আগ্রহ বরাবরই বেশি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকেই নিয়মিত গণিত, ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে টিউশনি করাতাম। এতে একদিকে নিজের হাতখরচ চলত, অন্যদিকে গণিত ও ইংরেজির ভিত্তিও শক্তিশালী হয়েছে। তবে একাডেমিক ফলাফল ভালো রাখার জন্য ফাইনাল পরীক্ষা সামনে এলে টিউশনি বন্ধ করে দিতাম। শুধু নিজের প্রয়োজনীয় হাতখরচ চালানোর জন্য একটি টিউশনি চালু রাখতাম।
করোনাকাল: কষ্ট নয়, ধৈর্যের সময়
মানুষের জীবন কখনো সরলরেখায় চলে না। করোনার সময়গুলো আমার জন্য একই সঙ্গে ছিল টিকে থাকা, ধৈর্য ধারণ এবং জীবনের অর্থ উপলব্ধি করার সময়।
আর্থিক অনটন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একসময় মনে হয়েছিল—পড়াশোনা করে হয়তো ভুলই করেছি। আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রবাসী অধ্যুষিত। আমার বাবাও দীর্ঘদিন প্রবাসে ছিলেন। পারিপার্শ্বিক নানা ঘটনায় বাবা-মা মাঝেমধ্যে মন খারাপ করতেন। আমাদের গ্রামীণ বাস্তবতায় এটি খুবই স্বাভাবিক।
তবে ছোটবেলা থেকেই আমি খুব স্বাধীনচেতা। বাবা-মা কখনো আমার ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেননি। তারা শুধু চেয়েছেন, আমি যেন সম্মানজনকভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারি এবং একটি সরকারি চাকরিতে যেতে পারি। পরিবারের এই মানসিক সমর্থন আমাকে অনেকটা স্বস্তি দিয়েছে এবং নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
করোনাকালে ‘প্রফেসর’ প্রশ্নব্যাংক পড়তে গিয়ে একসময় মনে হলো—শুধু প্রশ্ন সমাধান না করে মূল বইগুলো পড়লে আরও ভালো হবে। সেই চিন্তা থেকেই করোনার সময়ে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন লেখকের প্রায় ৫০টি উপন্যাস ও ছোটগল্প পড়ে ফেলেছিলাম। এতে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহ যেমন বেড়েছে, তেমনি সাহিত্যে আমার ভিত্তিও অনেকটা মজবুত হয়েছে।
তিনবার বিসিএসের লড়াই, অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য
৪৫তম বিসিএসে প্রথমবার অংশগ্রহণ করি। তখন মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। প্রথমবারেই প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। কিন্তু লিখিত পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। তবে আমার সহজাত দৃঢ়তা দিয়ে সেই ধাক্কা সামলে উঠি।
৪৬তম বিসিএস ছিল দ্বিতীয়বারের চেষ্টা। এবারও সফলভাবে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফলের শিটে নিজের রোল নম্বর না পেয়ে ভীষণ কষ্ট পাই।
তারপরও নিজের সংকল্প থেকে সরে আসিনি। বরং আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে তৃতীয়বারের মতো ৪৭তম বিসিএসে অংশগ্রহণ করি। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষা, ব্যর্থতা, হতাশা ও অধ্যবসায়ের পর আসে কাঙ্ক্ষিত সেই মুহূর্ত—৪৭তম বিসিএসে কাস্টমস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হই।
বর্তমানে আমি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে কর্মকর্তা (ক্যাশ) হিসেবে কর্মরত আছি।
‘আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা আমি নিজেই’
আমার সবচেয়ে বড় প্রেরণা আমি নিজেই। আমার বাবার একরোখা স্বভাব অনেকটাই পেয়েছি। জীবনে কখনো অতীতের অর্জনে থেমে থাকতে চাইনি। বরং সবসময় চেষ্টা করেছি নিজের আগের অবস্থানকে ছাড়িয়ে যেতে। প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়াই ছিল আমার চলার পাথেয়।
এই দীর্ঘ যাত্রায় আমার পরিবার সবসময় দ্বিধাহীনচিত্তে আমাকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়েছে। তাদের সমর্থন ছাড়া এতদূর আসা আমার জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল।
এ পথচলায় যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাকে সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। এমনকি আমার শত্রুদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা রয়েছে। কারণ, তাদের কাছ থেকেও আমি শিখেছি—ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে নিজেকে সংশোধন করতে হয় এবং আরও ভালোভাবে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।
করোনাকালকে আমি ‘কষ্টের সময়’ না বলে ‘ধৈর্যের সময়’ বলতে চাই। সেই সময় আমার চিন্তা, জীবনবোধ ও মানসিকতায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।
আসলে জীবনের প্রতিটি লক্ষ্য অর্জনই আনন্দের। তবে বিসিএসের ফলাফলে নিজের রোল নম্বর দেখতে পাওয়ার আনন্দ ছিল অন্যরকম। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, অপেক্ষা ও ব্যর্থতার পর সেই মুহূর্তটি আমার কাছে ছিল অত্যন্ত আবেগের।
তরুণদের জন্য আমার বার্তা
আমি বিশ্বাস করি, ইতিবাচক মনোভাব, কঠোর পরিশ্রম, ভালো ফ্রেন্ডসার্কেল, অসীম ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের পাশাপাশি আল্লাহর রহমত থাকলে বিসিএস ক্র্যাক করা অসম্ভব কিছু নয়।
মেডিকেল পরীক্ষায় দুইবার ব্যর্থতা আমাকে থামাতে পারেনি। ৪৫তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় ব্যর্থতা কিংবা ৪৬তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে নিজের রোল না পাওয়ার হতাশাও আমাকে আমার লক্ষ্য থেকে সরাতে পারেনি। বরং প্রতিটি ব্যর্থতা আমাকে আরও শক্ত করেছে, আরও শিখিয়েছে এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখতে শিখিয়েছে।
আজ আমি বাবা-মায়ের সেই স্বপ্নের ডাক্তার হতে পারিনি—কিন্তু তাদের আরেকটি বড় স্বপ্ন, সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ও সম্মানজনক পেশায় প্রতিষ্ঠিত করা, আলহামদুলিল্লাহ পূরণ করতে পেরেছি।
এখন আমার একটাই চাওয়া—দেশ ও মানুষের জন্য নির্মোহভাবে কাজ করতে পারি। সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে মানুষের সেবা করতে পারি।
বাংলা নিউজ মিডিয়া কর্তৃক সম্পাদিত ও প্রকাশিত
সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে WhatsApp & IMO 01886833283
সাথী সোহেল জনকল্যাণ ফাউন্ডেশন (আর্তমানবতার সেবায়) বিকাশঃ ০১৩০২৪৪৭৩৭৩