শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ন
আজকের শিরোনাম
ইসলামপুরে মাছ চুরি সন্দেহে এক যুবককে রাতভর নির্যাতন করে চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করল ইউপি সদস্য ভুরুঙ্গামারীতে মুভমেন্ট ফর পাংকচুয়ালিটির বর্ষপূর্তি উদযাপন আগামীর নিরাপদ বাংলাদেশ ভূগর্ভস্থ টানেল ও বাঙ্কার কি হতে পারে দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার নতুন দিগন্ত তাহিরপুর সীমান্তে মৃত্যুফাঁদ: ভারতের কয়লা খাদানে বাংলাদেশি নিহত। কোকদণ্ডী গুনাগরী উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত। সংগঠন বিরোধী কার্যকলাপের প্রতিবাদে জগন্নাথপুর সাংবাদিক ফোরামের নিন্দা। ডিসি ইলিয়াসকে বদলী করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে সুনামগঞ্জে মিষ্টি বিতরন ও আনন্দ মিছিল। “নূরীয়া মিশনের উদ্যোগে আজমিরীগঞ্জের সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের জন্য টিউবওয়েল প্রদান করা হয়েছে,,  সুনামগঞ্জে ডিসি ইলিয়াস মিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে বর্ষবরণ পালন করলো উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশঃ সুনামগঞ্জে সাংবাদিকের ওপর যুবদল ও সেচ্ছাসেবক দলনেতার হামলা।

দৈত্যের ক্ষুধা ও নবীজির বর্ণনায় সংসারাসক্তি

রিপোর্টারের নাম / ২১২ বার দেখা হয়েছে
আপডেট: শনিবার, ২ মার্চ, ২০২৪

মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী

ছেলেবেলায় দাদুর মুখে একটা গল্প শুনেছিলাম। এক দৈত্য সর্বক্ষণ মুখ হাঁ করে থাকত। ইয়া বড় মুখ। যখন হাঁ করে মনে হয় যেন দুনিয়াটাই গিলে ফেলব। একদিন সুখীপুর গ্রামে এসে হানা দিল দৈত্য। এর ঘর ভাঙে তো ওর গোলা গুঁড়িয়ে দেয়। এক চুমুকেই পুকুরের পানি মাছসুদ্ধ সাবাড় করে দেয়। শিশুরা ভয়ে তটস্থ। কেউ স্কুলে যেতে পারে না। মাঠে খেলতে যেতেও ভয়। গ্রামের একজন মুরুব্বি দৈত্যের কাছে গিয়ে বিনীত সুরে বলল, এভাবে আমাদের ওপর ধ্বংসযজ্ঞ না চালিয়ে চলো একটা মীমাংসার পথ বের করি। তোমার যখন ক্ষুধা লাগবে আমাদের বলবে, আমরা তোমার খাবার জোগাব। শর্তে দৈত্য রাজি হয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর দৈত্য বলল, ‘আমার ক্ষুধা পেয়েছে। খাবার চাই। হরিণের মাংস খাব।’ বলতে দেরি নেই পুরো গ্রামবাসী মহাধুমধামের সঙ্গে খাবারের বন্দোবস্ত শুরু করে দেয়। কেউ হরিণ শিকার করে আনল। কেউ বড় ডেকচিতে পানি গরম বসাল। কেউ লাকড়ি জোগাড় করল। কয়েক শ হরিণ রান্না শেষে দৈত্যের হাঁ করা মুখে সব মাংস একসঙ্গে পুড়ে দিল। মুহূর্তেই পেটে চালান করে দিয়ে আবার হাঁ করে মাংস চাইল দৈত্য। হায় হায়! এত মাংস খাওয়ার পরও আরও মাংস চায়! এ কেমন দৈত্য! গ্রামবাসীর এখন নিস্তার নেই। অবসর নেই। দৈত্যের মুখ ভরার জন্য রান্না আর রান্না। রান্না আর রান্না। এভাবেই যুগের পর যুগ বছরের পর বছর দৈত্যের পেট ভরাতে বেগার খেটে চলেছে গ্রামবাসী। দৈত্যের পেটও ভরে না, গ্রামবাসীরও আর রান্না শেষ হয় না। গল্প এখানেই শেষ।

শৈশবে প্রায়ই দাদুকে জিজ্ঞেস করতাম, ওই দৈত্যের পেট কবে ভরবে? কবে গ্রামবাসীর নিস্তার মিলবে? দাদু সঙ্গে সঙ্গে কোনো জবাব দিতেন না। বেশ অনেকক্ষণ চুপ থেকে উদাস গলায় বলতেন, ‘দৈত্যের কখনো পেট ভরবে না, গ্রামবাসীরও রান্না শেষ হবে না।’ দাদুর গলার উদাসভাব ছোট্ট মনে খুব আঘাতের মতো লাগত। ওই বয়সে নামাজে দোয়া করে বলতাম, আল্লাহ! আমাকে এত শক্তি দাও যেন ওই দৈত্যকে মেরে গ্রামবাসীকে মুক্তি দিতে পারি! আজ পরিণত বয়সে এসে সেই ছোট্টবেলার দোয়ার কথা মনে পড়লে নিজের অজানতেই হেসে ফেলি। গল্পের দৈত্য কি কখনো সত্য হয়?

 

একবার এক সুফিগুরুর সঙ্গে দেখা হয় দেশের বিখ্যাত এক পীরের খানকায়। সে এক মজার অভিজ্ঞতা। কথায় কথায় তিনি দৈত্যের গল্পটি বললেন। আমিও অনেকটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম। তবে স্মৃতির সমুদ্রে বেশিক্ষণ ডুবে থাকতে হয়নি। গল্পের শিক্ষাটি একটু ব্যতিক্রমী দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করলেন তিনি। শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সারা শরীর কেঁপে উঠল। হৃদয়ে এক ভাবাবেগের সৃষ্টি হলো। আবার অনুভব করলাম এখনো আমাদের জানার ও চিন্তার সীমানা কত ছোট।

সুফিগুরু বললেন, ‘ওই যে মুখ হাঁ করে আছে দৈত্য, ও হলো তোমার সংসার। আর গ্রামবাসী! যারা দিনরাত নিজেকে ভুলে, আপনজনদের ভুলে দৈত্যের জন্য রান্না করে চলেছে, সে হলো তুমি। এটা আসলে একটা প্রতীকী গল্প। দৈত্যরূপী সংসারের কখনো পেট ভরে না। সে বলে আরও চাই। আরও দাও। আর তোমারও কখনো বিশ্রাম করা হয়ে ওঠে না। এভাবেই তুমি, তোমার বাবা, তোমার দাদা সবাই বেগার খেটে মরেছ। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা এদের বিলাসী চাহিদা মেটাতে মেটাতে কখন যে নিজের আপনজন মাবুদ রব্বানাকে ভুলে বসেছ টেরও পাওনি। যখন হুঁশ ফেরে চেয়ে দেখ সামনে আজরাইল দাঁড়ানো। তাই তোমাদের সাবধান করে দিচ্ছি! সংসার সংসার করে নিজেকে আর শেষ কোরো না। নিজের আখেরাত ধ্বংস কোরো না।’

এবার বুঝতে পেরেছি দাদু কেন দৈত্য আর গ্রামবাসীর কথা শুনে তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দিতে পারতেন না। দাদু কেন ছোট্ট আমাকে বলতেন, দৈত্যের কখনো পেট ভরবে না, গ্রামবাসীরও কখনো নিস্তার মিলবে না। ঠিক এমনটিই পড়েছি হাদিসেও।

রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আদমসন্তানকে যদি একটি স্বর্ণের পাহাড় দেওয়া হয়, তাহলে সে আরেকটি স্বর্ণের পাহাড় চাইবে। যদি তাকে আরেকটি পাহাড় দেওয়া হয় তাহলে আরও স্বর্ণের পাহাড় কামনা করবে। আদমসন্তানের পেট কবরের মাটি ছাড়া পূর্ণ হবে না।’ সংসারের ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে রসুল (সা.) বলেছেন, ‘হুববুদ দুনিয়া রাসু কুল্লি খাতিয়াহ। সংসার আসক্তি সব গুনাহের মূল।’ বিষয়টি শুধু থিওরিটিক্যাল আলোচনার মধ্যেই রসুল (সা.) সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্র্যাকটিকালভাবেও রসুল (সা.) বুঝিয়ে দিয়েছেন সংসারের স্বরূপ কী!

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাকে সংসার ও সংসারের আসল চেহারা দেখাতে চাই।’ এ কথা বলে তিনি আমার হাত ধরে মদিনার একটি পরিত্যক্ত জঙ্গলে নিয়ে গেলেন। আমরা দেখলাম সেখানে অনেক মৃত মানুষের মাথার খুলি, হাড়গোড়, ছেঁড়া কাপড় ও মলমূত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

রসুল (সা.) আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘হে আবু হুরায়রা! এ খুলিগুলো তোমার মতোই পরিপূর্ণ মানুষ ছিল। আজ তোমার মনে যে কামনাবাসনা-উচ্চাকাক্সক্ষা আছে, এদের মনেও তাই ছিল। দিনের পর দিন তারা পয়সার পেছনে ছুটেছে। ভালো বাড়ি, উত্তম বাহনের নেশায় তারা বিভোর ছিল। হায় আফসোস! আজ তাদের দেহের ওপর চামড়া পর্যন্ত নেই। এই যে মলমূত্রগুলো দেখছ, এগুলো তাদেরই মলমূত্র। তারা যা খেয়েছে তা এখন দেখতে পাচ্ছ। এসব দেখে ঘৃণায় তোমার চোখ উল্টে যাচ্ছে। এ পোশাকগুলো তারা পরে কতই না গর্ব-অহংকার করত। এই যে ঘোড়ার খুর দেখতে পাচ্ছো, এগুলো তাদের ঘোড়া ছিল। সেগুলোও মরে পচে গেছে। হে আবু হুরায়রা! এই যদি হয় সংসারাসক্তির পরিণতি! তাহলে এখনই সময় সংসারের মোহ থেকে বেরিয়ে এসে আল্লাহর প্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার।’ (ইমাম গাজ্জালি, এহইয়াউল উলুমুদ্দিন, চতুর্থ খন্ড, ৪৩৩ পৃষ্ঠ।)

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ মুফাসসির সোসাইটি, পীর সাহেব, আউলিয়ানগর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরো খবর