সেলিনা সাথী
আমরা ‘মফিজ’—মানে মাথা নত না করা মানুষ
আমাদের আজকাল “মফিজ” বলে ডাকা হয়।
ব্যঙ্গ করে বলা হয়—
উত্তরবঙ্গের মানুষ নাকি বোঝে না,
চালাক না, আধুনিক না।
কিন্তু শোনো—
মফিজ কোনো গালি না।
মফিজ মানে—
যে ক্ষুধা সহ্য করতে পারে,
কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না।
মফিজ মানে—
যে লোভ বুঝে, তবু বিক্রি হয় না।
মফিজ মানে—
যার পকেট ফাঁকা থাকতে পারে,
কিন্তু মেরুদণ্ড ভাঙে না।
আমরা সেই মফিজ।
ইতিহাস বলছে—
পলাশীর যুদ্ধ–এর পরে
এই ভূখণ্ড চাইলে দাসত্ব বেছে নিতে পারত।
চাইলে ব্রিটিশের পা চেটে
উন্নয়ন কুড়িয়ে নিতে পারত।
কিন্তু উত্তরবঙ্গ সে পথ নেয়নি—
তাঁরা বেছে নিয়েছিল বিদ্রোহ।
এই মাটিতেই অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন
দেবী চৌধুরানী—
একজন নারী, যিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন
প্রতিরোধের কোনো লিঙ্গ নেই।
এই বাতাসেই প্রতিধ্বনিত হয়েছিল
নুরুলদিন–এর ডাক—
“জাগো বাহে কোনঠে সবায়!”
আজও সেই ডাক আমাদের রক্তে বাজে।
১৯৭১—
রংপুর–এর এক কিশোর
শঙ্কু সমজদার
সবার আগে বুক পেতে দেয় বুলেটের সামনে।
সে জানত—
স্বাধীনতা মানে সুবিধা নয়,
স্বাধীনতা মানে ত্যাগ।
২০২৪—
চারদিকে যখন হিসাবি নীরবতা,
তখন উত্তরবঙ্গ থেকেই উঠে আসে
আবু সাইদ—
সিনা টান করে দাঁড়িয়ে বলে দেয়—
দেশ কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি না।
আমরা উত্তরবঙ্গের মানুষ।
আমরা মঙ্গার সাথে লড়াই করে
বড় হওয়া মানুষ।
আমরা তিস্তা নদী–র চরে দাঁড়িয়ে
স্বপ্ন বোনা মানুষ।
আমরা চরবাসী।
আর সত্যটা হলো—
পুরো বাংলাদেশই এক বিশাল চর,
একটা কাঁপতে থাকা বেঙ্গল ডেল্টা।
এই চরের মানুষ জানে—
ভালো কী, খারাপ কী।
তারা ভালো চিনেও ছাড়ে না।
তারা যোগ্য দেখেও অযোগ্য বানায় না।
আমরা না খেয়ে থাকতে পারি,
কিন্তু দুই পয়সার ঝুটের জন্য
নিজেদের নৈতিকতা বিসর্জন দিই না।
তাই যখন কেউ ব্যঙ্গ করে বলে—
“এই তো মফিজ!”
আমরা হাসি।
কারণ আমরা জানি—
মফিজ মানে কাপুরুষ না,
মফিজ মানে আপসহীন।
মফিজ মানে সুবিধাবাদী না,
মফিজ মানে সংগ্রামী।
আর মনে রেখো—
যদি আবার দেশের প্রয়োজন হয়,
উত্তরবঙ্গ থেকে আবার আবু সাইদ উঠবে,
আবার শঙ্কু সমজদার শহিদ হবে,
আবার নুরুলদিন ডাক দেবে—
আর আমরা?
আমরা আবারও বুক পেতে দাঁড়াবো।
কারণ আমরা উত্তরবঙ্গ।
আমরা ক্ষুধার সন্তান, সংগ্রামের উত্তরাধিকারী।
আমরা “মফিজ”—
মানে মাথা নত না করা মানুষ।
——————————–
১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সময় দুপুর ১২:৪০
কবিতা কুটির -নীলফামারী।