নুর মোহাম্মদ
দাওয়াত প্রদান একটি গুণময়তা, দায়িত্বশীলতা, নৈতিক ও মূল্যবোধের বৈশিষ্ঠ। বহুমুখী আচার- অনুষ্ঠানে গুণীজন, রাষ্টীয় – সামাজিক ব্যক্তিবর্গ , প্রতিষ্ঠান , পরিবার সংগঠনকে দাওয়াত প্রদান করার রীতি- নীতি অনাদিকাল ধরে চলে আসছে। কাউকে কোন আচার- অনুষ্ঠান, কাজ বা দায়িত্বের দাওয়াত বা ইনভাইট প্রদান মানে তাকে মূল্যায়ন করা, সম্মান করা, অন্তর্ভুক্ত করা, মহব্বত করা, স্বীকৃতি দেয়া।দাওয়াত বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেমন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ওরশ শরীফ, বিয়ে, মেজবান,মাহফিল, রাজনৈতিক অনুষ্ঠান, স্কুল- কলেজের অনুষ্ঠান, মসজিদ – মাজারের অনুষ্ঠান, মাদ্রাসার অনুষ্ঠান, মতবিনিময়, পূণমীলনী, আকীকা, বার্থডে, মহোৎসব, বৈঠক, সেমিনার, ক্রীড়ানুষ্ঠান, ভ্রমণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক আয়োজন, বনভোজন প্রভৃতি।এসব দাওয়াতের অনুষ্ঠানের বিষয়ের মাঝে ধর্মীয়, আপ্যায়ন , দাতিত্বশীলতা, আলোচনা, বৈঠক, কাজ সহ আরো বিভিন্ন বিষয় আছে।অনেক দাওয়াতের কাজ অনেকে সহজভাবে প্রদান করেন। আবার অনেক সময় পছন্দ, অপছন্ন, সম্পর্কের টানাপোড়ন, মানুষের প্ররোচনায় কেউ কেউ আত্মীয়- স্বজন, বন্ধু- বান্ধব বা প্রতিবেশীদের কাউকে কাউকে বিভিন্ন দাওয়াতে সামর্থ্য থাকা সত্তেও বাদ দিয়ে দেয়। তাদের বলার আগ্রহ দেখায় না । তাতে সম্পর্কের মাঝে দূরত্ব ও সন্দেহ তৈরি হয়। অন্যদিকে কম সামর্থ্যের আয়োজন, বিশেষ করে খাবারের আয়োজনে ইচ্ছা থাকা সত্তে ও অনেকে কাছের মানুষকে ঠিকমত দাওয়াত দিতে পারে না। বিশেষ করে খাবার দাওয়াত যেমন ওরশ শরীফ, মাহফিল, মেজবান, মাহফিলের খাবার গ্রহণ করার পর অনেকে তার সমালোচনা করেন, বদনামী করেন যা আয়োজনকারী শুনলে ব্যতিত হন। আবার অনেক কাছের মানুষ বা প্রতিবেশী কোন আচার- অনুষ্ঠানে এসে যথাযথ সম্মান, মহব্বত বা আপ্যায়ন না পাওয়ার কারণে কাছের মানুষকে ভূল বুঝে। আবার অনেকে বিয়ে, মেজবান বা বড় কোন আয়োজনে বেশী ব্যস্ততা, দায়িত্ব ও মানুষের চাপে সবাইকে ঠিকমত সময় বা ঘরোয়াভাবে আপ্যায়ন করতে পারে না। তাতে কারো উপর রাগ, ক্ষোভ প্রকাশ করার কোন কারণ নেই। এসব বিষয় পরবর্তীতে কথাবার্তা বলে ঠিক করে নিলে উভয়ের জন্য তা সুফল, শান্তি, সুখাবহ বয়ে আনে।ইতিহাস বিশ্লেষণে জানা যায়, মুসলিম ধর্মীয় ক্ষেত্রে মহানবী ( সা:) মক্কায় দাওয়াতি কার্যক্রমে প্রধানত চারটি মূলনীতির উপর কাজ করেন। তার প্রধান দুটি হল প্রজ্ঞার সঙ্গে দাওয়াতে হানবী (সা.) দাওয়াতি কার্যক্রমে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞার পরিচয় দেন। তিনি এমন একটি কৌশল অবলম্বন করেন, যেন ইসলামের দাওয়াত অঙ্কুরেই বিনাশ হয়ে না যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি আপনার প্রভুর পথে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করুন। তাদের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক করুন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫) অন্যদিকে ক্ষমা ও উপেক্ষার বেলায় সব বাধা উপেক্ষা করা এবং সব অবিচার ক্ষমা করে দেওয়ার নীতি অবলম্বন করেই মহানবী (সা.) ও সাহাবিরা মক্কায় দ্বিনি দাওয়াত দেন। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষমা করো এবং উপেক্ষা করো যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর বিধান দান করেন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১০৯) এসব দাওয়াত বা আয়োজনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দাওয়াতের কৌশল ও নিয়মানুসারে সঠিকভাবে দাওয়াত প্রদান করা। যার ফলে দরকারী বা কাঙ্কিত ব্যক্তি আন্তরিকভাবে দাওয়াতে উপস্হিত হয়। এভাবে বিভিন্ন ধর্মের মহাপুরুষ, মনীষিরা বিভিন্ন ব্যক্তি ও জাতিকে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ভাল কাজের দাওয়াত দিয়েছেন।
কয়েক যুগ আগে ও দাওয়াতের উপায় ছিল সরাসরি বাড়ীতে গিয়ে, প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মৌখিকভাবে এবং কার্ড দিয়ে দাওয়াত প্রদান করা।প্রযুক্তির উন্নয়নে বর্তমানে মোবাইল ফোন, এসএমএস, কার্ড, ম্যাসেঞ্জার, ইমু, ওয়াটসআপ, ই- মেইল ও দাওয়াতের মাধ্বম হয়ে উঠেছে।পাশাপাশি সরাসরি বা কার্ড দিয়ে ও দাওয়াত প্রদানের নিয়ম চালু আছে।গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, ঘণিষ্ঠ মানুষের ক্ষেত্রে আয়োজনকারী, উদ্যোগতা, ছাহেবে দাওয়াত বা দায়িত্বশীলরা দাওয়াত প্রদান করলে এটার সৌন্দর্ষ, গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্বি পায়। এভাবে দাওয়াত বা ইনভাইট করলে কোন ক্রুটি খুঁজার, অভিমান, অভিযোগ করার সুযোগ পাবে না। সবক্ষেত্রে এরকম হওয়া উচিত বলে মনে করেন অনেকে।অনেক দাওয়াতে গুণীজন, বড়জন, আপনজন, আত্মীয়- স্বজন, বন্ধু- বান্ধব, শুভাকাঙ্গী ও সংশ্লিষ্ঠদের সঠিকভাবে দাওয়াত না দিলে তাহারা নাও আসতে পারে বা মনে কষ্ঠ পেতে পারে। তাই গুণীজন, বড়জন নিকটজনজনদের সরাসরি গিয়ে, কার্ড দিয়ে দাওয়াত প্রদান করাই হল মুল উপায় ।দাওয়াত প্রদানের দ্বারা পারস্পরিক সম্প্রীতি, আন্তরিকতা, আসা – যাওয়া, মায়া- মমতা, যোগাযোগ, মানবিকতা, আত্মীয়তা ও বন্দুত্বের বন্ধন বৃদ্বি পায়।এভাবে কোন দাওয়াত বা ইনভাইটে যোগদানের মাধ্বমে মানুষের সাথে মানুষের পরিচিতি, মমতা, যোগাযোগ, গ্রহণযোগ্যতা, সুসম্পর্ক বৃদ্বি পায়। ফলে নানান কাজের ও দায়িত্বের সুষম ক্ষেত্র সৃষ্ঠি হয়।অনেক সময় পথে- ঘাটে দেখা হলে, এক মাস, এক সম্পাহ আগে একজন একজনকে দাওয়াত দেয়।পরে সেই দাওয়াতের জন্য আর ফোন করে না, বা কার্ড দেয় না। এরকম সহজ দাওয়াতের কথা অনেকে গুরুত্ব দেয়, ভূলে যায়।তবে গুণীজন ও ধর্মীয় কোন আচার- অনুষ্ঠানের দাওয়াতে সহজভাবে যাওয়া পবিত্র দায়িত্ব বলে মনে করি। কারণ তাতে যোগদানের মাধ্বমে মানুষের অন্তর পরিশুদ্ব হয় এবং পরহেজগারী অর্জিত হয়।বর্তমান মোবাইল টেকনোলজির যুগে একটা দাওয়াতের ক্ষোত্রে কয়েকবার করে টেলিফোন করা বা ম্যাসেজ দেয়া দরকার। দাওয়াতের বিষয়ে ধনী- গরীব, শিক্ষিত- মূর্খ, সাদা- কালো হিসাব করা সমীচিন নয়। এরকম হিসাব করলে এবং যাকে অবহেলা করা হয় তার সাথে মনোভঙ্গ ও দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
লেখক : ব্যবস্হাপনা সম্পাদক, বিশ্ববম্দন।