তরিকুল ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি:
উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে পেয়েও অনেক তরুণ যখন চাকরির পিছে ছুটছেন কিংবা পৈতৃক ভিটামাটি ছেড়ে প্রবাসে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়ে সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রংপুরের সন্তান হাবিবুর রহমান হাবিব। উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট বাক্সবন্দী করে এগ্রো সেক্টরে নিজের কপাল পরিবর্তন করেছেন তিনি। পরিবার থেকে দূরে থাকা এবং মানসিক শান্তির অভাবে স্ত্রী মোছাঃ লাইজু আরা’র পরামর্শেই চাকরির মায়া ত্যাগ করে আজ তিনি একজন সফল কৃষি ও গবাদি পশু খামারী।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার কুরসা ইউনিয়নের কুরসা গ্রামের সন্তান হাবিবুর রহমান। রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে বাংলা বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করার পর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। এরপর কিছুদিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করেছিলেন। তবে অন্যের অধীনে চাকরি করার চেয়ে স্বাধীন কিছু করার তাগিদ থেকেই ২০০৯ সালে পোল্ট্রি ফার্ম দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে পোল্ট্রি থেকে সরে এসে গরু মোটাতাজাকরণ (ফ্যাটেনিং) প্রজেক্টে মনোযোগ দেন হাবিব।
হাবিবুর রহমানের খামারি জীবনের টার্নিং পয়েন্ট আসে গরু ফ্যাটেনিং প্রজেক্টে যুক্ত হওয়ার পর। পরিশ্রম আর সঠিক পরিকল্পনায় সাফল্য আসতে সময় লাগেনি। বিগত এক কোরবানির ঈদে ষাঁড়ের ব্যাচ থেকে ২৯টি গরু বিক্রি করে সব খরচ বাদ দিয়ে তিনি নিট আয় করেন প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টাকা।
বর্তমানে তাঁর খামারে রয়েছে ৩ মাসের বকনা ও ষাঁড়ের বিশেষ প্রজেক্ট। এতে তিনি প্রায় ২৩ লাখ টাকা মূল্যের গরু কিনেছেন। খাবার ও পরিচর্যা বাবদ আরও ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ শেষে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা নিট প্রফিটের আশা করছেন তিনি।
বর্তমানে হাবিবুরের খামারে ৩০টির মতো গরু রয়েছে—যার মধ্যে ২টি দানবীয় শাহীওয়াল ষাঁড় এবং বাকিগুলো বকনা গরু। হাটের দালালদের ওপর নির্ভর না করে তিনি নিজে লালমনিরহাটের বড়বাড়ী, রংপুরের সটিবাড়ী ও মধুপুর হাট ঘুরে দেখে শুনে গরু সংগ্রহ করেন।
স্বয়ংক্রিয় পানির পাত্র: শ্রমিক ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং গরুর নিরবচ্ছিন্ন পানির চাহিদা মেটাতে খামারে স্থাপন করেছেন ‘অটোমেটিক ওয়াটার ড্রিংকার সিস্টেম’।
পুষ্টিকর ও সাশ্রয়ী খাদ্য ব্যবস্থা: কাঁচা ঘাস ও খড়ের চড়া দামের বিকল্প হিসেবে তিনি সাইলেজ ব্যবহারে মনোযোগ দিয়েছেন। প্রতিটি গরুকে দিনে ৮–৯ কেজি সাইলেজ এবং বডি ওয়েট অনুযায়ী দেড় থেকে দুই কেজি নিজস্ব রেসিপিতে তৈরি দানাদার খাবার (ভুট্টা, সয়াবিন, খৈল, ডিওআরবি, ডিডিজিএস মিশ্রণ) দেওয়া হয়।
সহজ ও বৈজ্ঞানিক পরিচর্যা: নিয়মিত গোসল নিশ্চিত করার পাশাপাশি আইভারমেকটিন ইনজেকশন ও পরিমিত খৈল ব্যবহারের মাধ্যমে বাহ্যিক যত্ন নেন তিনি। এটি গরুর চামড়া উজ্জ্বল ও মসৃণ রাখার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তরুণ ও বেকারদের প্রতি বার্তা:
হাবিবুর রহমানের সাফ কথা, “শিক্ষিত অলসরাই মূলত বেকার, কোনো পরিশ্রমী শিক্ষিত মানুষ কখনোই বেকার থাকতে পারে না।” আজকের তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের সফলতা দেখে সময় নষ্ট না করে নিজের উদ্যোগ আজই শুরু করা উচিত। চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকা কিংবা প্রবাসে গিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি না খেটে নিজ দেশেই এগ্রিকালচার বা ভেটেরিনারি প্রজেক্ট গড়ে তোলার আহ্বান জানান এই সফল খামারি। হাবিবুর রহমানের এই সাফল্যগাথা আজ স্থানীয় যুবসমাজের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণার উৎস।