বরিশালের বানারীপাড়ায় এক প্রবাসী পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে জমি দখল, হুমকি-ধমকি এবং সরকারি সম্পত্তির ভিটি বরাদ্দ নিয়ে অনিয়মেরও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, বানারীপাড়া উপজেলার বাসিন্দা মো. আলী হোসেন মোল্লা জেএল ৪২ নম্বর মৌজার এসএ খতিয়ান নং-৫৯৪ ও ৫৯১ এবং হাল খতিয়ান নং-৫৯৭ ও ৫৮৯-এর সংশ্লিষ্ট দাগ থেকে ২৪ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। একই দাগে গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লা দুটি সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে ৩১ শতাংশ জমি ক্রয় করেন বলে দাবি করা হয়েছে। জমির দখল ও মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল।
আলী হোসেন মোল্লার পরিবারের অভিযোগ, তাদের ক্রয়কৃত জমির প্রায় ৪ শতাংশ দীর্ঘদিন ধরে গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লা দখলে রেখেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একাধিকবার সালিশ বৈঠক হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য আতিক মোল্লা জানান, তিনি ও তার ভাই-বোনেরা দীর্ঘ ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে প্রবাসে থাকেন। বাড়িতে তাদের বৃদ্ধ বাবা-মা বসবাস করেন। ছুটিতে দেশে এসে তিনি দেখতে পান, তাদের জমি থেকে গাছ কাটা হচ্ছে। এতে বাধা দিলে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে তিনি বানারীপাড়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
আতিক মোল্লার ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযোগের পর বানারীপাড়া থানার এসআই বারেক উভয় পক্ষের কাগজপত্র যাচাই করেন এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে উভয় পক্ষের আমিন এবং সরকারি আমিনের উপস্থিতিতে জমি পরিমাপ করা হয়। তাদের দাবি, পরিমাপে মঞ্জু মোল্লার দখলে তাদের জমির প্রায় ৩ শতাংশ অতিরিক্ত পাওয়া যায়। পরে স্থানীয় সালিশদারদের উপস্থিতিতে ওই জমি পরিমাপ করে সীমানা নির্ধারণ এবং পাকা পিলার স্থাপন করা হয়।
আতিক মোল্লা আরও অভিযোগ করেন, সালিশের মাধ্যমে জমির সীমানা নির্ধারণের মাত্র দুই দিন পর তার বাবা ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। তার দাবি, মামলাটিকে কেন্দ্র করে তাদের পরিবারকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মামলার সাক্ষী হিসেবে নাম আসা বানারীপাড়া পৌরসভার সাবেক ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর গৌতম সমাদ্দার বলেন, এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানেন না। তার ভাষ্য, মঞ্জু মোল্লা তাকে জিজ্ঞেস করে সাক্ষী বানাননি এবং কীভাবে তার নাম সাক্ষী হিসেবে এসেছে, সেটিও তিনি জানেন না। তবে স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে জমির বিষয়টি মীমাংসা হওয়ার কথা তিনি শুনেছেন বলে জানান।
জমির মালিক মো. আলী হোসেন মোল্লা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে তাদের পরিবারের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে সালিশে তারা সঠিক বিচার পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা এবং তার সন্তানরা দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে রয়েছেন। তাদের পরিবারের কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মামলা করার কারণ হিসেবে ‘সামাজিক ও রাজনৈতিক কিছু বিষয়’ রয়েছে বলে জানান। এরপর সাংবাদিকের পরিচয় জানতে চেয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে জানা গেছে।
এদিকে সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও কিছু অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় একটি সূত্রের দাবি, গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লার আপন ছোট ভাই প্রয়াত ফারুকের স্ত্রী ও দুই কন্যার সম্পত্তি নিয়েও বিরোধ রয়েছে এবং সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এ অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া বানারীপাড়া বাজারের সরকারি চান্দিনা ভিটি বরাদ্দ নিয়েও গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বানারীপাড়া পৌরসভার মেয়র থাকাকালে নিজের নামসহ কয়েকজন আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির নামে একাধিক সরকারি ভিটি বরাদ্দ নিয়েছিলেন এবং এর মধ্যে কয়েকটি ভিটি পরবর্তীতে অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ অভিযোগের বিষয়ে গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী সত্য নারায়ণ ভিটি ক্রয়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারি সম্পত্তি কোনো ব্যক্তি নিজের ইচ্ছায় বিক্রি করতে পারেন না। এগুলো লিজ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে জমি সংক্রান্ত বিরোধ, মামলা এবং সরকারি সম্পত্তির ভিটি বরাদ্দ নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র, আদালতের নথি ও সরকারি রেকর্ড যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।